মঙ্গলবার ২৬ মে ২০২৬ - ০৯:৩৩
এই দোয়ায়ে আরাফা পড়লেই বুঝবেন— কেন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আমাদের পূর্বপুরুষরা “হুসাইন, হুসাইন” বলে এসেছেন!

আরাফার রাত ও দিন এমন এক রহমত, ক্ষমা ও প্রত্যাবর্তনের দরজা উন্মুক্ত করে, যেখানে কোনো তওবাকারীকেই নিরাশ হয়ে ফিরতে হয় না। এই সুযোগ পার্থিব হিসাব-নিকাশের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষকে এমন এক নির্মল অবস্থায় পৌঁছে দিতে পারে, যেন সে মাতৃগর্ভ থেকে সদ্য জন্ম নেওয়া নিষ্পাপ শিশুর মতো পবিত্র হয়ে গেছে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: মরহুম আল্লামা জাফরী (রহ.) তাঁর এক বক্তব্যে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর দোয়ায়ে আরাফার আলোকে তওবা, আল্লাহর রহমতের প্রতি আশা এবং জীবনের পরিবর্তনশীল বাস্তবতা সম্পর্কে গভীর তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা করেছেন। নিচে তার চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করা হলো:

হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) আরাফার ময়দানে দাঁড়িয়ে তাঁর প্রভুর সঙ্গে যে হৃদয়স্পর্শী মুনাজাত করেছিলেন, সেখান থেকে আমরা কয়েকটি বাক্য পাঠ করতে চাই— যেন উপলব্ধি করতে পারি, কেন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আমাদের পূর্বপুরুষরা “হুসাইন, হুসাইন” বলে এসেছেন। আজ সেই ধারাবাহিকতার দায়িত্ব এসে পৌঁছেছে আমাদের কাছেও, আর এ ধারা যুগের পর যুগ অব্যাহত থাকবে।

কারণ—

যার হৃদয় প্রেমে জীবন্ত হয়ে উঠেছে, সে কখনো মরে না;
বিশ্বজগতের পাতায় তার স্থায়িত্ব চিরলিখিত।

আবা আবদিল্লাহ ইমাম হুসাইন (আ.) দোয়ায়ে আরাফার এক স্থানে বলেন,

إِلَهِی إِنَّ اخْتِلَافَ تَدْبِیرِکَ وَ سُرْعَةَ طَوَاءِ مَقَادِیرِکَ مَنَعَا عِبَادَکَ الْعَارِفِینَ بِکَ عَنِ السُّکُونِ إِلَی عَطَاءٍ وَ الْیَأْسِ مِنْکَ فِی بَلَاءٍ

অর্থাৎ— “হে আমার প্রতিপালক! তোমার সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থাপনার বৈচিত্র্য এবং তাকদিরের দ্রুত পরিবর্তন তোমার আরিফ বান্দাদের এ শিক্ষা দিয়েছে যে, কোনো প্রাপ্তির ওপর তারা যেন নির্ভর না করে এবং কোনো বিপদে পড়ে তোমার রহমত থেকে যেন নিরাশ না হয়।

মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন—

یَمْحُو اللَّهُ مَا یَشَاءُ وَیُثْبِتُ وَعِنْدَهُ أُمُّ الْکِتَابِ

আল্লাহ যা ইচ্ছা মুছে দেন এবং যা ইচ্ছা স্থির রাখেন; আর মূল গ্রন্থ তাঁর কাছেই রয়েছে।” [সূরা রা‘দ : ৩৯]

ইমাম হুসাইন (আ.)-এর এ বক্তব্যের কোরআনিক ভিত্তি এ আয়াতেই নিহিত রয়েছে। আবার আল্লাহ তাআলা বলেন—

لِکَی لَا تَأْسَوْا عَلَیٰ مَا فَاتَکُمْ وَلَا تَفْرَحُوا بِمَا آتَاکُمْ

অর্থাৎ— যাতে তোমরা হারানো বিষয়ের জন্য অতিরিক্ত দুঃখ না কর এবং যা তোমাদের দেওয়া হয়েছে, তার জন্য অহংকারে মত্ত না হও।

অর্থাৎ, যা চলে গেছে— তা চলে গেছে। অতীতের জন্য হাহাকার নয়; বরং সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়াই মুমিনের পথ।

মানুষের মানসিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য এর চেয়ে মহৎ নীতি আর কী হতে পারে!

যা হারিয়ে গেছে, তার পেছনে পড়ে থাকার প্রয়োজন নেই। বরং সর্বদা সামনে তাকাতে হবে—

গভীরভাবে দেখো, আমরা বসে থাকলেও এগিয়ে চলেছি;
দেখতে পাচ্ছ না— আমরা নতুন এক গন্তব্যের বার্তাবাহক!

তাহলে কেন মানুষ অতীত নিয়ে পড়ে থাকে? কেন বলে— “আহা! যৌবন কত দ্রুত চলে গেল!” বরং নিজেকে বলুন— “যৌবন চলে যাওয়াটাও তো আল্লাহর বিধান।” বর্তমানকে উপলব্ধি করুন, এই মুহূর্তকেই মূল্য দিন।

আল্লাহর বিধানই এমন— সবকিছুই পরিবর্তনশীল। শক্তি ক্ষয় হবে, জনপদ ধ্বংস হবে, সৌন্দর্য ম্লান হবে। এটাই সৃষ্টিজগতের নিয়ম। সুতরাং এই পরিবর্তনের স্রোত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুন। অকারণে কান্নাকাটি কেন? বরং উপলব্ধির হাসি হাসুন।

এই পরিবর্তনের ধারার সামনে মানুষ মূলত দুই দলে বিভক্ত— এক দল শুধু আফসোস করে— “সব চলে গেল, হারিয়ে গেল…” তাদের দীর্ঘশ্বাসের যেন শেষ নেই।

আরেক দল হাসিমুখে এগিয়ে চলে। কারণ তারা জানে—
গভীরভাবে দেখো, আমরা বসে থাকলেও এগিয়ে চলেছি;
দেখতে পাচ্ছ না— আমরা নতুন এক গন্তব্যের বার্তাবাহক!”

আমরা এক নতুন জগতের দিকে যাত্রা করছি। প্রতিটি নিঃশ্বাসের সঙ্গে আমরা আল্লাহর আরও নিকটবর্তী হচ্ছি। তাহলে দুঃখ কেন? হতাশা কেন?

لِکَیْ لاَ تَأْسَوْا عَلَیٰ مَا فَاتَکُمْ وَ لاَ تَفْرَحُوا بِمَا آتَاکُمْ


সুতরাং জীবনকে কেবল শোকের চোখে দেখা নয়; বরং আল্লাহর নির্ধারিত চলমান বিধানের অংশ হিসেবে গ্রহণ করাই প্রকৃত প্রজ্ঞা। কারণ, এই বিশ্বজগতের ভিত্তিই হলো পরিবর্তন, গতি এবং চিরন্তন প্রত্যাবর্তনের সত্য।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha